Table of Content

কিভাবে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা যায়?

কিভাবে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা যায়?

একটি ব্যবসা যখন ছোট পরিসর থেকে বড় হতে শুরু করে, তখন অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহ, নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করা এবং ব্যবসার কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এ সময় অনেক উদ্যোক্তা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করার কথা ভাবেন। তবে এই পরিবর্তন শুধু কোম্পানির নামের শেষে থাকা কয়েকটি শব্দ বদলে দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে কোম্পানির সংঘবিধি, শেয়ারহোল্ডার, পরিচালনা পর্ষদ, আইনি কাগজপত্র এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম জড়িত।

কিভাবে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা যায়?

বাংলাদেশে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করার প্রধান আইনি ভিত্তি হলো কোম্পানি আইন, ১৯৯৪। এই আইনের ২৩১ ধারায় প্রাইভেট কোম্পানিকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরের বিধান রয়েছে। সাধারণভাবে, কোম্পানির সদস্যদের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংঘবিধি সংশোধন করতে হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (RJSC) প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়া মানেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া নয়। শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) প্রযোজ্য নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের শর্তও পূরণ করতে হয়।

প্রাইভেট লিমিটেড ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির মধ্যে পার্থক্য

রূপান্তরের প্রক্রিয়া বোঝার আগে দুই ধরনের কোম্পানির পার্থক্য জানা ভালো। কারণ কোন ধরনের ব্যবসার জন্য কোন কাঠামো উপযুক্ত, তা নির্ভর করে মালিকদের পরিকল্পনা, মূলধনের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের ওপর।

বিষয় প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি
মালিকানা সাধারণত সীমিতসংখ্যক সদস্যের মধ্যে থাকে বৃহত্তর বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে
শেয়ার হস্তান্তর সংঘবিধিতে সাধারণত শেয়ার হস্তান্তরে বিধিনিষেধ থাকে প্রাইভেট কোম্পানির মতো একই ধরনের বাধ্যতামূলক বিধিনিষেধ থাকে না
জনসাধারণের কাছে শেয়ার প্রস্তাব জনসাধারণকে শেয়ার বা ঋণপত্র গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে প্রযোজ্য আইন ও অনুমোদন মেনে জনসাধারণের কাছে শেয়ার প্রস্তাবের সুযোগ থাকতে পারে
পরিচালনা তুলনামূলকভাবে ছোট পরিচালনা কাঠামোতে চলতে পারে পরিচালনা পর্ষদ, প্রতিবেদন ও নিয়ম মেনে চলার দায়িত্ব বেশি হতে পারে
মূলধন সংগ্রহ প্রতিষ্ঠাতা, বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডার ও নির্দিষ্ট বিনিয়োগকারীদের ওপর বেশি নির্ভরশীল আইনগত শর্ত পূরণ করলে বৃহত্তর বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী থেকে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে
তথ্য প্রকাশ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হয় বিশেষ করে জনসাধারণের কাছে শেয়ার প্রস্তাব বা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে

পার্থক্যগুলো সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য। কোনো কোম্পানি পাবলিক হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে না। একইভাবে, পাবলিক কোম্পানি হওয়ার কারণে কোম্পানির সব শেয়ার জনসাধারণের কাছে বিক্রি করা বাধ্যতামূলক নয়।

কেন একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়?

কোম্পানির রূপান্তরের পেছনে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কারণ থাকতে পারে। সব কোম্পানির জন্য এই পরিবর্তন প্রয়োজনীয় নয়। তবে ব্যবসার আকার, মূলধনের চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

১. ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য মূলধন সংগ্রহ

একটি কোম্পানি নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বাড়ানো, নতুন শাখা খোলা বা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতাদের নিজস্ব অর্থ কিংবা ব্যাংকঋণ দিয়ে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সব সময় সম্ভব হয় না। পাবলিক কোম্পানি কাঠামো ভবিষ্যতে আইনসম্মতভাবে বৃহত্তর বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহের পথ তৈরি করতে পারে।

তবে এই সুযোগ পাওয়ার জন্য শুধু কোম্পানিকে পাবলিক হিসেবে রূপান্তর করলেই হবে না। জনসাধারণের কাছে শেয়ার ইস্যু করতে হলে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজ আইন ও অনুমোদনের শর্ত পূরণ করতে হবে।

২. নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করা

প্রাইভেট কোম্পানিতে মালিকানা সাধারণত নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ব্যবসা বড় হলে নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে। পাবলিক কোম্পানি কাঠামো এ ধরনের সম্প্রসারণের জন্য উপযুক্ত হতে পারে, বিশেষ করে যখন কোম্পানি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত মালিকানা কাঠামো গড়তে চায়।

৩. ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি

কিছু কোম্পানি ভবিষ্যতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (IPO) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করতে চায়। সে ক্ষেত্রে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ হতে পারে। কিন্তু এটি পুরো প্রক্রিয়ার শেষ নয়। আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, পরিচালনা কাঠামো, মূলধন, তথ্য প্রকাশ এবং BSEC-এর প্রযোজ্য নিয়ম পূরণ করতে হয়।

৪. প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামো উন্নত করা

ব্যবসার আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক হিসাব, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বও বাড়ে। পাবলিক কোম্পানির কাঠামো গ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান আরও আনুষ্ঠানিক পরিচালনা পদ্ধতি গড়ে তুলতে পারে। তবে এই সুবিধা তখনই কাজে আসে, যখন কোম্পানি বাস্তবেও সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইনের বিধান অনুযায়ী, একটি প্রাইভেট কোম্পানি তার সংঘবিধি এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারে, যাতে প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বিধানগুলো আর সেখানে না থাকে। এই ধারায় রূপান্তরের জন্য কোম্পানির সদস্যসংখ্যা কমপক্ষে সাতজন হওয়ার শর্তও উল্লেখ রয়েছে।

প্রাইভেট কোম্পানির সংঘবিধিতে সাধারণত এমন বিধান থাকে, যা শেয়ার হস্তান্তর সীমিত করে, সদস্যসংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখে এবং জনসাধারণকে শেয়ার বা ঋণপত্র গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো নিষিদ্ধ করে। রূপান্তরের সময় প্রযোজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব বিধান পর্যালোচনা ও সংশোধন করতে হয়।

একই সঙ্গে কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ার কাঠামো এবং অন্যান্য করপোরেট নথিও যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনীয় সংশোধনের ধরন কোম্পানির বিদ্যমান নথি এবং রূপান্তরের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করবে।

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারায় রূপান্তরের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের কাছে প্রসপেক্টাস অথবা আইনে নির্ধারিত তথ্যসহ প্রসপেক্টাসের পরিবর্তে বিবরণী দাখিলের বিধান রয়েছে। কোন নথি কীভাবে প্রস্তুত ও দাখিল করতে হবে, তা কোম্পানির পরিস্থিতি এবং কার্যকর বিধান অনুযায়ী যাচাই করা জরুরি।

আইনের এই সময়সীমাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নথি জমা দিতে দেরি করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সভার তারিখ নির্ধারণের আগেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো।

প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের ধাপ

রূপান্তরের কাজকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করলে প্রক্রিয়াটি বুঝতে সুবিধা হয়। নিচে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ ধাপগুলো তুলে ধরা হলো। নির্দিষ্ট কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত অনুমোদন বা নথির প্রয়োজন হতে পারে।

ধাপ ১: কোম্পানির বর্তমান অবস্থা যাচাই করুন

প্রথমে কোম্পানির বর্তমান আইনি ও আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি, মেমোরেন্ডাম, সংঘবিধি, শেয়ারহোল্ডারদের তালিকা, পরিচালকদের তথ্য, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং RJSC-তে দাখিল করা আগের রিটার্নগুলো যাচাই করা উচিত।

কোনো বার্ষিক রিটার্ন বাকি আছে কি না, শেয়ার বরাদ্দের তথ্য সঠিকভাবে দাখিল করা হয়েছে কি না, পরিচালকদের তথ্য হালনাগাদ আছে কি না এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো চলমান আইনি সমস্যা রয়েছে কি না, সেগুলোও দেখতে হবে। আগে থেকে নথিতে ভুল থাকলে রূপান্তরের সময় সংশোধন করতে হতে পারে।

এই পর্যায়ে একজন অভিজ্ঞ কোম্পানি আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অথবা কোম্পানি সচিবের সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে। এতে ভুল নথি জমা দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা মিস করার ঝুঁকি কমে।

ধাপ ২: শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করুন

রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। কোম্পানি কেন পাবলিক হতে চায়, ভবিষ্যতে কীভাবে মূলধন সংগ্রহ করবে, মালিকানার কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে এবং পরিচালনা পর্ষদে কী পরিবর্তন আসতে পারে, তা পরিষ্কার করা উচিত।

বিশেষ করে প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান শেয়ারহোল্ডারদের বুঝতে হবে যে কোম্পানির মালিকানা কাঠামো বিস্তৃত হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হলে তাদের অধিকার, তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং শেয়ারসংক্রান্ত বিষয়গুলো আইন ও কোম্পানির নথি অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে।

ধাপ ৩: সদস্যসংখ্যা ও পরিচালনা পর্ষদের শর্ত যাচাই করুন

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারায় প্রাইভেট কোম্পানি থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কমপক্ষে সাতজন সদস্যের শর্ত রয়েছে। তাই কোম্পানির বর্তমান সদস্যসংখ্যা এই শর্ত পূরণ করে কি না, তা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে সদস্যসংখ্যা ও শেয়ার মালিকানার কাঠামো আইনসম্মতভাবে সাজাতে হবে।

এ ছাড়া পাবলিক কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য পরিচালকের সংখ্যা ও যোগ্যতা, পরিচালকদের সম্মতি এবং অন্যান্য পরিচালনাগত শর্তও যাচাই করতে হবে। পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করা জরুরি। শুধু সদস্যসংখ্যা বাড়ালেই সব আইনি শর্ত পূরণ হয়ে যায় না।

ধাপ ৪: সংঘবিধি সংশোধনের খসড়া তৈরি করুন

রূপান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কোম্পানির আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন বা সংঘবিধি সংশোধন করা। এই নথিতে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, শেয়ার হস্তান্তর, সভা, পরিচালকদের ক্ষমতা এবং অন্যান্য করপোরেট নিয়ম উল্লেখ থাকে।

প্রাইভেট কোম্পানির জন্য নির্দিষ্ট যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি পাবলিক কোম্পানি হিসেবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হতে পারে। কোম্পানির মেমোরেন্ডামেও পরিবর্তন দরকার কি না, তা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে।

এই খসড়া তৈরির সময় ইন্টারনেট থেকে পাওয়া কোনো সাধারণ নমুনা সরাসরি ব্যবহার করা ঠিক নয়। প্রতিটি কোম্পানির শেয়ার কাঠামো, ব্যবসার উদ্দেশ্য ও পরিচালনা পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। তাই চূড়ান্ত নথি আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর মাধ্যমে যাচাই করানো ভালো।

ধাপ ৫: বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করুন

সংঘবিধি সংশোধন এবং কোম্পানির রূপান্তরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে শেয়ারহোল্ডারদের সভা আহ্বান করতে হয়। সাধারণত এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য বিশেষ সিদ্ধান্ত বা স্পেশাল রেজল্যুশন গ্রহণের প্রয়োজন হয়। সভার নোটিশ, আলোচ্যসূচি, কোরাম এবং ভোটের পদ্ধতি কোম্পানি আইন ও বিদ্যমান সংঘবিধি অনুযায়ী অনুসরণ করতে হবে।

সভায় কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের প্রস্তাব, সংঘবিধি সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা যেতে পারে। সদস্যদের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে সভার কার্যবিবরণীতে লিখে রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ধাপ ৬: বিশেষ সিদ্ধান্ত RJSC-তে দাখিল করুন

বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে RJSC-তে তা দাখিল করতে হয়। RJSC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ সিদ্ধান্তের জন্য Form VIII ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৮৮ ধারার অধীনে এই ফরম দাখিলের সময়সীমা সভার তারিখ থেকে ১৫ দিন।

তবে Form VIII জমা দেওয়াই রূপান্তরের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সমান নয়। কোম্পানির পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশোধিত সংঘবিধি, প্রসপেক্টাস অথবা প্রসপেক্টাসের পরিবর্তে বিবরণী, পরিচালকদের তথ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিও প্রস্তুত ও দাখিল করতে হতে পারে।

RJSC-এর অনলাইন সিস্টেমে নথি জমা দেওয়ার আগে ফরমের সর্বশেষ নির্দেশনা ও সংযুক্তির তালিকা দেখে নেওয়া উচিত। কোনো নথি অনুপস্থিত থাকলে বা তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে।

ধাপ ৭: প্রসপেক্টাস বা বিকল্প বিবরণী প্রস্তুত করুন

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারার অধীনে রূপান্তরের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রসপেক্টাস অথবা প্রসপেক্টাসের পরিবর্তে বিবরণী দাখিলের বিধান রয়েছে। কোন নথিটি প্রযোজ্য হবে এবং এতে কী কী তথ্য থাকতে হবে, তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা ও তফসিল অনুসারে নির্ধারণ করতে হবে।

প্রসপেক্টাস হলো এমন একটি নথি, যাতে জনসাধারণের কাছে শেয়ার বা সিকিউরিটিজ প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। এতে কোম্পানির ব্যবসা, মূলধন, আর্থিক অবস্থা, পরিচালনা, ঝুঁকি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে রূপান্তরের জন্য দাখিল করা নথি এবং জনসাধারণের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য ব্যবহৃত প্রসপেক্টাসের আইনি উদ্দেশ্য এক নয়।

তাই কোম্পানি শুধু পাবলিক কাঠামো গ্রহণ করতে চায়, নাকি ভবিষ্যতে জনসাধারণের কাছ থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, তা শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। নথির ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনুমান না করে সংশ্লিষ্ট আইন ও RJSC-এর নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

ধাপ ৮: পরিচালকদের তথ্য ও অন্যান্য নথি হালনাগাদ করুন

রূপান্তরের সময় বা এর পর পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন হলে প্রয়োজনীয় ফরম ও নথি জমা দিতে হবে। RJSC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালকদের সম্মতিপত্রের জন্য Form IX এবং পরিচালকদের বিবরণ ও পরিবর্তনের তথ্যের জন্য Form XII প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে কোন ফরম কখন লাগবে, তা প্রকৃত পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ওপর নির্ভর করবে।

কোম্পানির নিবন্ধিত কার্যালয়ের ঠিকানা পরিবর্তন হলে Form VI-সংক্রান্ত দাখিলের প্রয়োজন হতে পারে। শেয়ার বরাদ্দ, অনুমোদিত মূলধন বৃদ্ধি বা অন্যান্য পরিবর্তন ঘটলে সেগুলোর জন্য আলাদা ফরম ও সময়সীমা প্রযোজ্য হতে পারে। রূপান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, এমন অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় ফরম জমা দেওয়ার বদলে প্রযোজ্য নথির তালিকা যাচাই করা ভালো।

ধাপ ৯: RJSC-এর নথি যাচাই ও আপডেটের অবস্থা নিশ্চিত করুন

প্রয়োজনীয় নথি দাখিলের পর আবেদন বা রিটার্নের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। RJSC কোনো সংশোধন, অতিরিক্ত তথ্য বা নথি চাইলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা সরবরাহ করতে হবে। সব দাখিল সম্পন্ন হয়েছে কি না, সংশোধিত নথি রেকর্ডে প্রতিফলিত হয়েছে কি না এবং কোম্পানির করপোরেট রেকর্ডে কোনো অসম্পূর্ণতা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রূপান্তরের সিদ্ধান্ত, দাখিলের রসিদ, সংশোধিত সংঘবিধি এবং সংশ্লিষ্ট নথির কপি কোম্পানির নিজস্ব রেকর্ডে সংরক্ষণ করুন। ভবিষ্যতে ব্যাংক, বিনিয়োগকারী, নিরীক্ষক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব নথি দেখতে চাইতে পারে।

ধাপ ১০: রূপান্তরের পর নিয়মিত কমপ্লায়েন্স বজায় রাখুন

রূপান্তরের কাজ শেষ হওয়ার পরও কোম্পানির দায়িত্ব শেষ হয় না। বার্ষিক সাধারণ সভা, বার্ষিক রিটার্ন, আর্থিক বিবরণী, নিরীক্ষা, পরিচালকদের তথ্য এবং অন্যান্য আইনগত দাখিল যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে। কোম্পানির কার্যক্রম ও মূলধনের ধরন অনুযায়ী আরও কিছু বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।

যদি কোম্পানি ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চায়, তাহলে BSEC এবং সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী আলাদা প্রস্তুতি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা, নিরীক্ষিত হিসাব, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে তথ্য প্রকাশের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

প্রাইভেট থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?

নথির সঠিক তালিকা কোম্পানির বর্তমান অবস্থা, সংশোধনের ধরন এবং RJSC-এর প্রযোজ্য নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত বা যাচাই করে রাখা উপকারী।

কাগজপত্র কেন প্রয়োজন হতে পারে
বর্তমান মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন কোম্পানির উদ্দেশ্য, মূলধন ও মৌলিক কাঠামো যাচাই করতে
বর্তমান আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন প্রাইভেট কোম্পানির বিধান শনাক্ত ও সংশোধন করতে
সংশোধিত সংঘবিধি পাবলিক কোম্পানি হিসেবে প্রযোজ্য পরিচালনা কাঠামো নির্ধারণ করতে
বিশেষ সিদ্ধান্তের কপি শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন প্রমাণ করতে
সভা আহ্বানের নোটিশ ও কার্যবিবরণী সভা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার রেকর্ড রাখতে
সদস্য ও শেয়ারহোল্ডারদের বিবরণ সদস্যসংখ্যা ও শেয়ার মালিকানার অবস্থা যাচাই করতে
পরিচালকদের সম্মতিপত্র ও বিবরণ পরিচালনা পর্ষদসংক্রান্ত প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে
প্রসপেক্টাস অথবা বিকল্প বিবরণী কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারার প্রযোজ্য দাখিল সম্পন্ন করতে
RJSC-এর নির্ধারিত ফরম বিশেষ সিদ্ধান্ত, পরিচালক বা অন্যান্য পরিবর্তনের তথ্য দাখিল করতে
আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষা-সংক্রান্ত নথি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা যাচাই এবং প্রযোজ্য প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে

এই তালিকাকে চূড়ান্ত সরকারি চেকলিস্ট হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আবেদন করার আগে RJSC-এর সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নিতে হবে। কোম্পানির ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো অনুমোদন, ঋণদাতার সম্মতি, চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা বা খাতভিত্তিক নিয়ম প্রযোজ্য হলে অতিরিক্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে।

প্রাইভেট থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তর করতে কত সময় লাগে?

রূপান্তরের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময় লাগে না। কোম্পানির নথি আগে থেকেই হালনাগাদ থাকলে এবং শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মতবিরোধ না থাকলে প্রস্তুতির কাজ তুলনামূলক সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, সংঘবিধিতে বড় পরিবর্তন, পরিচালকদের পরিবর্তন, পুরোনো রিটার্নের ঘাটতি বা নথির ভুল থাকলে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে।

সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

  • কোম্পানির বিদ্যমান নথি সঠিক ও হালনাগাদ কি না।
  • শেয়ারহোল্ডারদের সভা আয়োজন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কত সময় লাগছে।
  • সংশোধিত সংঘবিধি ও অন্যান্য নথি প্রস্তুত করতে কত দিন লাগছে।
  • RJSC-তে দাখিলের পর অতিরিক্ত তথ্য বা সংশোধন চাওয়া হচ্ছে কি না।
  • কোম্পানির অন্য কোনো আইনগত বা চুক্তিগত বিষয় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন কি না।

তাই যাচাই ছাড়া নির্দিষ্ট কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে রূপান্তর সম্পন্ন হবে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। আইন নির্ধারিত দাখিলের সময়সীমা এবং কর্তৃপক্ষের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সময় আলাদা বিষয়।

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের খরচ কত?

রূপান্তরের মোট খরচ কোম্পানির নথি, মূলধন, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং পেশাগত সহায়তার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে সব কোম্পানির জন্য একটি নির্দিষ্ট মোট খরচ বলা কঠিন। আবেদন করার আগে সম্ভাব্য খরচের খাতগুলো আলাদা করে হিসাব করা ভালো।

  • RJSC ফি: নির্ধারিত ফরম, রিটার্ন এবং প্রযোজ্য দাখিলের জন্য সরকারি ফি লাগতে পারে।
  • স্ট্যাম্প ও অন্যান্য সরকারি চার্জ: নথি ও লেনদেনের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য হতে পারে।
  • আইনজীবীর ফি: সংঘবিধি সংশোধন, বিশেষ সিদ্ধান্ত এবং আইনি পর্যালোচনার জন্য।
  • কোম্পানি সচিব বা পেশাজীবীর ফি: নথি প্রস্তুত, দাখিল ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার জন্য।
  • হিসাব ও নিরীক্ষার খরচ: আর্থিক নথি যাচাই বা প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য।

কোম্পানি যদি শুধু আইনি কাঠামো পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে তার খরচ আর IPO বা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির খরচ এক হবে না। জনসাধারণের কাছে শেয়ার ইস্যু করতে চাইলে ইস্যু ব্যবস্থাপক, আন্ডাররাইটার, নিরীক্ষা, আইনি পরামর্শ এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।

সঠিক বাজেট তৈরির জন্য RJSC-এর বর্তমান ফি তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কাছ থেকে লিখিত হিসাব নেওয়া উচিত। পুরোনো কোনো অনলাইন নিবন্ধে উল্লেখ করা ফি বর্তমানেও প্রযোজ্য, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

রূপান্তরের পর কি কোম্পানি শেয়ারবাজারে শেয়ার বিক্রি করতে পারবে?

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার পর শেয়ারবাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু পাবলিক কোম্পানি হওয়া এবং IPO-এর মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করা আলাদা আইনি প্রক্রিয়া। কোম্পানিকে প্রযোজ্য BSEC বিধি, আর্থিক শর্ত, নিরীক্ষা, তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম পূরণ করতে হবে।

বাংলাদেশে জনসাধারণের কাছে ইকুইটি সিকিউরিটিজ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে BSEC-এর প্রযোজ্য পাবলিক অফার বিধি অনুসরণ করতে হয়। কোম্পানির ধরন ও প্রস্তাবের পদ্ধতি অনুযায়ী যোগ্যতা, মূলধন, আর্থিক ফলাফল, ইস্যু ব্যবস্থাপক এবং আন্ডাররাইটার-সংক্রান্ত শর্ত থাকতে পারে। এসব শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার সময় কার্যকর বিধি যাচাই করা জরুরি।

কোম্পানি যদি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চায়, তাহলে রূপান্তরের আগেই সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির শর্ত যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে এমন কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন এড়ানো সম্ভব, যা পরে সংশোধন করতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ লাগাতে পারে।

রূপান্তরের সময় যেসব ভুল এড়ানো উচিত

আইনি প্রক্রিয়ায় ছোট ভুলও অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব তৈরি করতে পারে। তাই শুরু থেকেই কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

১. শুধু কোম্পানির নাম পরিবর্তন করাকে রূপান্তর মনে করা

কোম্পানির নামের শেষে “প্রাইভেট লিমিটেড” বাদ দিয়ে “পাবলিক লিমিটেড” লিখলেই আইনি রূপান্তর সম্পন্ন হয় না। প্রযোজ্য সংঘবিধি সংশোধন, বিশেষ সিদ্ধান্ত, নির্ধারিত নথি দাখিল এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়।

২. শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন উপেক্ষা করা

রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সভার নিয়ম, নোটিশ এবং ভোটের প্রক্রিয়া ঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে। সদস্যদের অনুমোদন ও সিদ্ধান্তের রেকর্ড যথাযথ না হলে পরে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

৩. RJSC-এর সময়সীমা মিস করা

বিশেষ সিদ্ধান্ত এবং রূপান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত নথির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে। কোন নথি কখন জমা দিতে হবে, তা আগেই লিখে রাখা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা ভালো।

৪. পুরোনো সংঘবিধি যাচাই না করা

অনেক সময় কোম্পানির মূল নথি বহু বছর আগে তৈরি করা হয়। পরে শেয়ার বরাদ্দ বা পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন হলেও নথি হালনাগাদ করা হয় না। রূপান্তরের আগে এসব অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করে সমাধান করা দরকার।

৫. পাবলিক কোম্পানি হওয়ার পরও কমপ্লায়েন্স অবহেলা করা

পাবলিক কোম্পানির কাঠামো গ্রহণ করার পর প্রযোজ্য সভা, রিটার্ন, নিরীক্ষা এবং অন্যান্য দায়িত্ব যথাসময়ে পালন করতে হবে। শুধু নিবন্ধনসংক্রান্ত কাজ শেষ করে নথি সংরক্ষণ বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়।

৬. আইনি পরামর্শ ছাড়া নথি তৈরি করা

সাধারণ নমুনা দেখে সংঘবিধি বা প্রসপেক্টাস তৈরি করলে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাদ পড়তে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শুরু থেকেই কোম্পানি আইন ও সিকিউরিটিজ আইনে অভিজ্ঞ পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া ভালো।

প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা

রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি নতুন দায়িত্বগুলোও বিবেচনা করা দরকার।

সম্ভাব্য সুবিধা সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা
বৃহত্তর বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ আইনি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বৃদ্ধি
ভবিষ্যতে জনসাধারণের কাছে শেয়ার প্রস্তাবের সম্ভাবনা সিকিউরিটিজ আইন ও অনুমোদনের অতিরিক্ত শর্ত
বড় ব্যবসায়িক পরিকল্পনার জন্য মূলধন সংগ্রহের সম্ভাবনা নিরীক্ষা, প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশের খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে
আরও আনুষ্ঠানিক পরিচালনা কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিক আনুষ্ঠানিকতা ও জবাবদিহি
ভবিষ্যৎ তালিকাভুক্তির জন্য প্রাথমিক কাঠামো তৈরি তালিকাভুক্তির যোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হয় না

কোম্পানির ব্যবসা যদি ছোট হয় এবং ভবিষ্যতে বাইরের বিনিয়োগ নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে শুধু মর্যাদা বাড়ানোর জন্য পাবলিক কাঠামো গ্রহণ করা প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসার লক্ষ্য, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মিলিয়ে দেখা উচিত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. বাংলাদেশে কি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা যায়?

হ্যাঁ। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারায় এ ধরনের রূপান্তরের বিধান রয়েছে। প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করে সংঘবিধি সংশোধন, প্রয়োজনীয় বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং RJSC-তে নির্ধারিত নথি দাখিল করতে হয়।

২. রূপান্তরের জন্য কমপক্ষে কতজন সদস্য দরকার?

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারায় প্রাইভেট কোম্পানি থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কমপক্ষে সাতজন সদস্য থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। কোম্পানির বর্তমান সদস্যসংখ্যা ও অন্যান্য শর্তও যাচাই করতে হবে।

৩. রূপান্তরের জন্য কি নতুন কোম্পানি নিবন্ধন করতে হয়?

সাধারণভাবে বিদ্যমান কোম্পানিকে আইন অনুযায়ী রূপান্তর করা হয়। এটি নতুন কোম্পানি গঠনের একই প্রক্রিয়া নয়। তবে কোম্পানির বর্তমান নথি, সংশোধনের ধরন এবং RJSC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দাখিল সম্পন্ন করতে হবে।

৪. রূপান্তরের জন্য কোন ফরম গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষ সিদ্ধান্ত দাখিলের জন্য Form VIII গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালকদের সম্মতি বা তথ্য পরিবর্তনের মতো বিষয় থাকলে Form IX ও Form XII-ও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কোন ফরমগুলো লাগবে, তা কোম্পানির প্রকৃত পরিবর্তন ও RJSC-এর বর্তমান নির্দেশনা দেখে নিশ্চিত করতে হবে।

৫. রূপান্তরের পর কি কোম্পানি সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারবে?

পাবলিক কোম্পানি হিসেবে জনসাধারণের কাছে শেয়ার প্রস্তাবের সুযোগ থাকতে পারে। তবে শেয়ার ইস্যু করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন মানতে হবে। বিশেষ করে IPO করতে চাইলে BSEC-এর প্রযোজ্য বিধি ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের শর্ত পূরণ করতে হয়।

৬. পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেই কি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া যায়?

না। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়া এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আলাদা বিষয়। তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিকে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ ও BSEC-এর প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হবে।

৭. রূপান্তর করতে কি আইনজীবী নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক?

প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ধরনের পেশাগত সহায়তার বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। তবে সংঘবিধি সংশোধন, বিশেষ সিদ্ধান্ত এবং নির্ধারিত নথি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কোম্পানি আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কোম্পানি সচিবের সহায়তা নেওয়া উপকারী।

৮. রূপান্তরের খরচ কি সব কোম্পানির জন্য একই?

না। সরকারি ফি, নথি প্রস্তুত, আইনি পরামর্শ, হিসাব ও নিরীক্ষার প্রয়োজন এবং অন্যান্য পরিবর্তনের ওপর মোট খরচ নির্ভর করে। সঠিক বাজেটের জন্য RJSC-এর বর্তমান ফি তালিকা এবং পেশাজীবীদের কাছ থেকে খরচের হিসাব নেওয়া উচিত।

৯. রূপান্তরের জন্য কত দিনের মধ্যে RJSC-তে নথি জমা দিতে হয়?

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৩১ ধারায় রূপান্তরের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রসপেক্টাস অথবা প্রসপেক্টাসের পরিবর্তে বিবরণী দাখিলের বিধান রয়েছে। বিশেষ সিদ্ধান্তের জন্য Form VIII দাখিলের সাধারণ সময়সীমা ১৫ দিন। প্রতিটি নথির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সময়সীমা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

শেষ কথা

একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এগোনো জরুরি। প্রথমে কোম্পানির বর্তমান নথি ও আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে হবে। এরপর সদস্যসংখ্যা, পরিচালনা পর্ষদ, সংঘবিধি এবং শেয়ার কাঠামোর প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবশেষে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ ও RJSC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত নথি জমা দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রূপান্তর এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিকে এক করে দেখা যাবে না। কোনো কোম্পানির লক্ষ্য যদি শুধু পাবলিক কাঠামো গ্রহণ করা হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আর লক্ষ্য যদি জনসাধারণের কাছ থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করা বা IPO-এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করা হয়, তাহলে শুরু থেকেই BSEC-এর প্রযোজ্য নিয়ম ও আর্থিক যোগ্যতা বিবেচনায় রাখা উচিত।

নথি জমা দেওয়ার আগে কোম্পানি আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা অভিজ্ঞ কোম্পানি সচিবের মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাই করালে ভুলের ঝুঁকি কমতে পারে। এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য লেখা; এটি নির্দিষ্ট কোম্পানির জন্য আইনি বা আর্থিক পরামর্শের বিকল্প নয়।

তথ্যসূত্র

দ্রষ্টব্য: আইন, বিধি, ফি ও দাখিলের পদ্ধতি পরিবর্তিত হতে পারে। বাস্তবে রূপান্তরের কাজ শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করুন।

Post a Comment