ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় বাড়ল, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া জমা দেওয়ার সুযোগ
ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় বাড়ল, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া জমা দেওয়ার সুযোগ
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট করদাতারা আগামী ২৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সুদ ও জরিমানা ছাড়াই ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর এনবিআরের জারি করা আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
যেসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে পারেননি, তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে সময় বাড়ানো হয়েছে বলেই বিষয়টি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখা ঠিক হবে না। রিটার্ন প্রস্তুত করতে প্রয়োজনীয় হিসাব, বিক্রির তথ্য, ক্রয়ের নথি এবং প্রযোজ্য করের বিবরণ আগে থেকেই মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
একই সময়ে সরকার মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছে। এতে সাধারণ করদাতা এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে বর্তমান সময়ের বিশেষ ছাড় এবং ভবিষ্যতের নিয়মিত সময়সীমা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা জরুরি।
ভ্যাট রিটার্ন জমার নতুন সময়সীমা এক নজরে
| বিষয় | বিস্তারিত |
|---|---|
| রিটার্নের কর মেয়াদ | জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
| বর্ধিত সময়সীমা | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ |
| রিটার্ন জমার মাধ্যম | এনবিআরের ই-ভ্যাট ব্যবস্থা |
| বর্ধিত সময়ের সুবিধা | নির্ধারিত শর্তে সুদ ও জরিমানা ছাড়া রিটার্ন জমা |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা | জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) |
| নতুন অধ্যাদেশের নাম | মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ |
| সাধারণ রিটার্নের নিয়মিত সময় | কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিন |
| বিশেষ শ্রেণির রিটার্নের নিয়মিত সময় | কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ২০ দিন |
গুরুত্বপূর্ণ: ২৫ অক্টোবরের সময়সীমাটি জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের জন্য দেওয়া বিশেষ সুবিধা। নিয়মিত রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যাদেশের বিধান এবং পরবর্তী এনবিআর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
কেন ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় বাড়ানো হলো?
জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭-এ ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করা হয়। নতুন বিধান কার্যকর করতে এনবিআরের ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন প্রয়োজন হয়েছে।
এই পরিবর্তনের কারণে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদের রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাড়তি সময়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। জনস্বার্থ বিবেচনায় এনবিআর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে এই বিশেষ মেয়াদে সুদ ও জরিমানা দিতে হবে না।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। সময়সীমা বাড়ানোর অর্থ ভ্যাটের সব দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়। এটি মূলত রিটার্ন দাখিলের জন্য অতিরিক্ত সময়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট পরিশোধের দায় থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট আইন ও নির্দেশনা অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। রিটার্ন জমা এবং কর পরিশোধের বিষয়টি এক করে দেখা উচিত নয়।
২৫ অক্টোবর পর্যন্ত কারা ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে পারবেন?
এনবিআরের ঘোষিত বিশেষ সময়সীমা অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন যেসব করদাতার জমা দেওয়ার কথা ছিল, তারা এই সুবিধার আওতায় পড়তে পারেন। মূল বিষয় হলো, রিটার্নটি সংশ্লিষ্ট তিন মাসের কর মেয়াদের হতে হবে এবং এনবিআরের আদেশে উল্লেখিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
সাধারণভাবে যেসব ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে, তাদের নিয়মিত হিসাব অনুযায়ী রিটার্ন প্রস্তুত করতে হয়। দোকান, পাইকারি ব্যবসা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য নিবন্ধিত ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম আলাদা হতে পারে। তাই শুধু ব্যবসার ধরন দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও করসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
যেসব করদাতার বিষয়টি আগে দেখা উচিত
- যেসব নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন এখনো জমা দেয়নি।
- যেসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়, ক্রয় বা হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করতে দেরি হয়েছে।
- যেসব ব্যবসায়ী ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় রিটার্ন প্রস্তুত করেছেন, কিন্তু এখনো দাখিল সম্পন্ন করেননি।
- যেসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক বা কর পরামর্শক প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করছেন।
- যেসব প্রতিষ্ঠানের রিটার্নে কোনো সংশোধন বা তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের অবস্থা, কর মেয়াদ বা বিশেষ করব্যবস্থা আলাদা হলে তার জন্য ভিন্ন বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তাই নিজের প্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় রয়েছে কি না, তা ই-ভ্যাট ব্যবস্থা এবং এনবিআরের মূল আদেশ থেকে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
ভ্যাট রিটার্ন জমার নতুন নিয়ম কী?
সরকারের জারি করা মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রিটার্ন জমার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। অধ্যাদেশটি ১৪ অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এতে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৬৪ ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, সাধারণ নিবন্ধিত, তালিকাভুক্ত, নিবন্ধনযোগ্য বা তালিকাভুক্তিযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শূন্য রিটার্ন জমাদানকারীদের জন্য ২০ দিনের সময় রাখা হয়েছে।
এই নিয়মের ফলে করদাতাদের রিটার্ন জমার তারিখ সম্পর্কে আরও সতর্ক থাকতে হবে। আগে থেকে হিসাব প্রস্তুত না থাকলে শেষ কয়েক দিনে সব তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন অনেক লেনদেন হয়, তাদের নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ করা জরুরি।
সাধারণ করদাতাদের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সাধারণ নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হবে। একইভাবে, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন কিংবা তালিকাভুক্তির আওতায় পড়েন, তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।
ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানের মাসিক কর মেয়াদ ৩১ অক্টোবর শেষ হলো। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, সেই কর মেয়াদের রিটার্ন প্রস্তুত করে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে নির্দিষ্ট মাসের প্রকৃত শেষ তারিখ, সরকারি ছুটি এবং এনবিআরের কোনো বিশেষ নির্দেশনা থাকলে তা যাচাই করতে হবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২৫ অক্টোবরের বিশেষ সময়সীমাকে সব মাসের রিটার্নের সাধারণ শেষ তারিখ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। এটি নির্দিষ্ট তিনটি কর মেয়াদের জন্য ঘোষিত সময় বৃদ্ধি। পরবর্তী কর মেয়াদের ক্ষেত্রে নিয়মিত বিধান কার্যকর থাকবে, যদি না এনবিআর নতুন কোনো আদেশ জারি করে।
কোন প্রতিষ্ঠানগুলো ২০ দিনের সময় পাবে?
নতুন অধ্যাদেশে কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতার জন্য কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।
শূন্য রিটার্ন বলতে সাধারণভাবে এমন রিটার্ন বোঝানো হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদে দেখানোর মতো প্রযোজ্য লেনদেন বা করযোগ্য কার্যক্রম নেই। তবে কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেই প্রত্যেক ক্ষেত্রে একইভাবে শূন্য রিটার্ন দাখিল করা যাবে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের অবস্থা ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
বিশেষ শ্রেণির জন্য ২০ দিনের সময় রাখা হলেও রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে যায় না। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তার নিবন্ধন বহাল থাকলে রিটার্নের প্রয়োজন হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট সার্কেল বা যোগ্য কর পরামর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
সরকারি ছুটিতে ভ্যাট রিটার্ন জমার শেষ তারিখ পড়লে কী হবে?
নতুন বিধানে রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত শেষ দিনে সরকারি ছুটি থাকলে পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি করদাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ ছুটির কারণে অফিস বন্ধ থাকা বা প্রশাসনিক কার্যক্রম সীমিত থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে করদাতাদের নিজের হিসাব অনুযায়ী শেষ দিন নির্ধারণ করে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা উচিত নয়। অনলাইন ব্যবস্থায় রক্ষণাবেক্ষণ, লগইন সমস্যা, নথির ঘাটতি বা পেমেন্টসংক্রান্ত জটিলতার কারণে শেষ মুহূর্তে রিটার্ন জমা দিতে সমস্যা হতে পারে। তাই সময় হাতে থাকতেই কাজ শেষ করা ভালো।
ছুটির দিনের হিসাব বা পরবর্তী কার্যদিবস নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে এনবিআরের প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা দেখে নিশ্চিত হতে হবে। বিশেষ সময়সীমা বাড়ানোর আলাদা আদেশ থাকলে সেটিও প্রযোজ্য হতে পারে।
এনবিআর কি ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় আরও বাড়াতে পারবে?
নতুন অধ্যাদেশে জনস্বার্থ বিবেচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে রিটার্ন জমার সময় বাড়ানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত পরিস্থিতিতে এনবিআর সুদ ও জরিমানা ছাড়া রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়াতে পারে। তবে এই ক্ষমতা থাকলেই প্রতিটি কর মেয়াদে সময় বাড়ানো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণত সংশ্লিষ্ট আদেশের শর্ত অনুযায়ী কার্যকর হয়। কোনো সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে কি না, তা জানার জন্য সরকারি ঘোষণা, এনবিআরের ওয়েবসাইট এবং প্রযোজ্য প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ওপর একমাত্র নির্ভর করা উচিত নয়।
ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো নিয়মিত সময়সীমার মধ্যেই রিটার্ন প্রস্তুত ও দাখিল করা। বিশেষ ছাড় এলে সেটিকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু নিয়মিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নয়।
ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি
জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ই-ভ্যাট ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের আগে প্রয়োজনীয় হিসাব ও নথি প্রস্তুত থাকলে ভুল কম হয় এবং শেষ মুহূর্তের চাপও কমে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় তথ্য এক নয়। ব্যবসার ধরন, নিবন্ধনের অবস্থা, লেনদেন এবং প্রযোজ্য করব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে নথি আলাদা হতে পারে। নিচের বিষয়গুলো প্রাথমিক প্রস্তুতির জন্য কাজে লাগতে পারে।
১. প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন
প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর, ব্যবসার পরিচিতি এবং ই-ভ্যাট অ্যাকাউন্টের তথ্য ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করুন। ভুল তথ্য থাকলে রিটার্ন দাখিলের সময় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
২. বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব মিলিয়ে নিন
সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদের বিক্রয়, ক্রয় এবং অন্যান্য প্রযোজ্য লেনদেনের হিসাব একসঙ্গে যাচাই করুন। চালান, হিসাবের খাতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে আগে তা সমাধান করা উচিত।
৩. প্রযোজ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের তথ্য প্রস্তুত রাখুন
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক পরিশোধের তথ্যও ভ্যাট রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য হলে তার হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।
৪. রিটার্নের তথ্য জমা দেওয়ার আগে পুনরায় পরীক্ষা করুন
অনলাইনে তথ্য পূরণ করার পর জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য মিলিয়ে নিন। ভুল করের হিসাব, অসম্পূর্ণ তথ্য বা ভুল কর মেয়াদ নির্বাচন করলে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
৫. রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন হলে প্রাপ্ত স্বীকৃতি, রসিদ বা সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করুন। ভবিষ্যতে হিসাব যাচাই, অডিট বা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন হলে এগুলো কাজে লাগতে পারে।
এই ধাপগুলো সাধারণ প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনা। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য কোন ফরম, নথি বা অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন হবে, তা এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।
নতুন অধ্যাদেশে ইলেকট্রনিক রিটার্ন জমার গুরুত্ব
নতুন অধ্যাদেশে এনবিআরকে নির্দিষ্ট নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, যেসব করদাতার ক্ষেত্রে এ ধরনের নির্দেশনা কার্যকর হবে, তাদের নির্ধারিত অনলাইন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
অনলাইনে রিটার্ন জমার সুবিধা হলো, তথ্য ডিজিটালভাবে দাখিল করা যায় এবং প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণ সহজ হতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে ব্যবসার হিসাবও সঠিকভাবে রাখতে হবে। কেবল অনলাইন ফরম পূরণ করলেই হিসাবের ভুল দূর হয়ে যায় না।
যেসব প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক নেই, তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে রিটার্নের নিয়ম ও সময়সীমা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত হিসাবরক্ষক বা কর পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
ভ্যাট রিটার্ন জমা না দিলে কী সমস্যা হতে পারে?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সুদ, জরিমানা বা অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিধান, করদাতার অবস্থা এবং এনবিআরের আদেশের ওপর নির্ভর করে।
বর্তমান বিশেষ সময়সীমার আওতাভুক্ত করদাতারা ২৫ অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই সময়ের সুবিধা নিতে হলে রিটার্নটি নির্ধারিত কর মেয়াদের হতে হবে এবং প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হবে। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর একই সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে হলেও আগে নিবন্ধন ও আইনি বাধ্যবাধকতা যাচাই করা উচিত। ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা, বিক্রি না হওয়া বা কার্যক্রম কমে যাওয়া মানেই সব ক্ষেত্রে রিটার্নের দায় শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
ব্যবসায়ীদের এখন কী করা উচিত?
ব্যবসায়ীদের জন্য প্রথম কাজ হলো জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন জমা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা। জমা না হয়ে থাকলে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা নিতে হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছে, তাদেরও দাখিলের স্বীকৃতি ও হিসাবের নথি সংরক্ষণ করা উচিত। কোনো তথ্য ভুল হয়েছে বলে মনে হলে সংশোধনের পদ্ধতি সম্পর্কে এনবিআরের নির্দেশনা যাচাই করতে হবে। নিজে থেকে অনুমান করে কোনো তথ্য পরিবর্তন করা ঠিক নয়।
নিয়মিত রিটার্নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করতে পারে। প্রতি কর মেয়াদ শেষে বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব প্রস্তুত করা, প্রযোজ্য কর নির্ধারণ, নথি যাচাই এবং অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার কাজ আলাদা ধাপে ভাগ করলে শেষ মুহূর্তে চাপ কমে।
ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই অভ্যাস কার্যকর। কারণ নিয়মিত হিসাব না রাখলে রিটার্নের সময় পুরোনো চালান খোঁজা, লেনদেনের তথ্য মেলানো এবং করের হিসাব ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভ্যাট রিটার্নের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা কী সুবিধা পাবেন?
সময় বাড়ানোর সরাসরি সুবিধা হলো, নির্ধারিত কর মেয়াদের রিটার্ন প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার জন্য করদাতারা অতিরিক্ত সময় পাচ্ছেন। যেসব প্রতিষ্ঠান ই-ভ্যাট ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে সমস্যায় পড়েছে, তাদের জন্যও এই সময় কাজে লাগতে পারে।
এতে ব্যবসায়ীরা হিসাব যাচাইয়ের সুযোগ পান। কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে তা সংগ্রহ করা, প্রযোজ্য করের হিসাব মিলিয়ে নেওয়া এবং রিটার্ন জমার প্রক্রিয়া শেষ করা সহজ হতে পারে। তবে এই সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তার ওপর।
বিশেষ ছাড়কে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা উচিত নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার অভ্যাস থাকলে ভবিষ্যতে নতুন নিয়ম কার্যকর হলেও ব্যবসার হিসাব পরিচালনা তুলনামূলক সহজ হবে।
ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
- জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের বিশেষ বর্ধিত সময়সীমা ২৫ অক্টোবর ২০২৬।
- এই সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ করে রিটার্ন জমা দিলে ঘোষিত সুবিধা অনুযায়ী সুদ ও জরিমানা এড়ানো যাবে।
- নিয়মিত রিটার্নের সাধারণ সময়সীমা কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিন।
- নির্দিষ্ট বিশেষ শ্রেণির প্রতিষ্ঠান ও শূন্য রিটার্ন জমাদানকারীদের জন্য ২০ দিনের বিধান রয়েছে।
- প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্কের তথ্য রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক হতে পারে।
- বিশেষ সময়সীমা, করের দায় এবং অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে মূল আদেশ যাচাই করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ কত?
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন জমার বিশেষ বর্ধিত সময়সীমা ২৫ অক্টোবর ২০২৬। এই সময়ের মধ্যে ঘোষিত শর্ত পূরণ করে রিটার্ন জমা দিলে সুদ ও জরিমানা ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে।
২৫ অক্টোবরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে কি জরিমানা দিতে হবে?
এনবিআরের বিশেষ আদেশে উল্লেখিত জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের রিটার্ন নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে জমা দিলে সুদ ও জরিমানা ছাড়া দাখিলের সুযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট করদাতার ক্ষেত্রে আদেশটি প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন নিয়মে সাধারণ ব্যবসায়ীরা কত দিনের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেবেন?
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সাধারণ নিবন্ধিত, তালিকাভুক্ত, নিবন্ধনযোগ্য বা তালিকাভুক্তিযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে।
কোন প্রতিষ্ঠানগুলো ২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে পারবে?
নতুন বিধানে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শূন্য রিটার্ন জমাদানকারীদের জন্য কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ২০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করা উচিত।
শূন্য রিটার্ন জমা দিতে হলেও কি সময়সীমা মানতে হবে?
হ্যাঁ, শূন্য রিটার্নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে। নতুন অধ্যাদেশে এই শ্রেণির জন্য ২০ দিনের সময় রাখা হয়েছে।
ভ্যাট রিটার্ন জমার শেষ দিন সরকারি ছুটি হলে কী হবে?
নতুন বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শেষ দিন সরকারি ছুটি হলে পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
এনবিআর কি আবার ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় বাড়াতে পারে?
হ্যাঁ, জনস্বার্থ বিবেচনায় এনবিআর বিশেষ আদেশের মাধ্যমে সুদ ও জরিমানা ছাড়া রিটার্ন জমার সময় বাড়াতে পারে। তবে ভবিষ্যতে সময় বাড়ানো হবে কি না, তা আগে থেকে নিশ্চিত বলা যায় না।
অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন কোথায় জমা দিতে হবে?
এনবিআরের নির্ধারিত ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে। সঠিক পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং প্রযোজ্য নির্দেশনার জন্য এনবিআরের সরকারি ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুসরণ করুন।
ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার পর কী করতে হবে?
রিটার্ন দাখিলের স্বীকৃতি, রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের নথি সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো তথ্য ভুল হলে সংশোধনের নিয়ম সম্পর্কে এনবিআরের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
শেষ কথা
জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এই সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা সুদ ও জরিমানা ছাড়া দাখিলের সুযোগ পাবেন। তাই যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো রিটার্ন জমা দেয়নি, তাদের দ্রুত হিসাব প্রস্তুত করে কাজটি শেষ করা উচিত।
অন্যদিকে, নতুন মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী সাধারণ করদাতাদের জন্য ১৫ দিন এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য ২০ দিনের নিয়মিত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দুই ধরনের সময়সীমার পার্থক্য বুঝে চলা জরুরি। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ও শর্ত নিশ্চিত করতে এনবিআরের সরকারি আদেশ অনুসরণ করুন।
তথ্যসূত্র: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদেশ এবং ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত যুগান্তর, জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা পোস্ট, বাংলাবার্তা ও এখন টিভির প্রতিবেদন।
