Table of Content

কিভাবে বুঝবেন আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়েছে?

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পাবে। সেই লক্ষণগুলো যদি আপনার জানা থাকে, তবে বুঝতে পারবেন আপনার শরীরের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোন অবস্থায় রয়েছে।

এই লেখায় এমন কিছু লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি যেগুলো আপনাকে জানান দেবে আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দূর্বল হয়ে গিয়েছে বা কমে গিয়েছে। তার আগে আসুন জেনে নেই-

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাকে বলে?

সাধারণ জ্বর, সর্দি বা কাশি হলে তা নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। আবার শরীরের কোথাও কেটে গেলে নিজ থেকেই রক্তপাত বন্ধ হয়ে যেতে দেখি আমরা। কিছুদিন পরই কাটা স্থান সম্পূর্ণ আগের মত হয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তা আমাদের শরীরে এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যাতে শরীর কোন কারণে অসুস্থ হলে শরীর নিজেই তা ঠিক করে নিতে পারে। এ চমৎকার ব্যবস্থাটিকেই বলা হয় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা Immune System (ইমিউন সিস্টেম)।

ইম্যুনিটি সিস্টেম প্রতিটি শরীরেই সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলে আমাদের চারপাশে অসংখ্য রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু থাকা সত্ত্বেও আমরা রোগাক্রান্ত হই না।

কিন্তু কিছু কিছু কারণে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। আর এটার কিছু লক্ষণও রয়েছে যেগুলো দ্বারা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ার লক্ষণ

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে শরীরে কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। বৈশিষ্ট্যগুলো খেয়াল করলে আমরা সহজেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারব। চলুন এমন ১০টি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

তবে, আগেই বলে নেয়া ভাল যে, বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।  আসুন, আগে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দূর্বল হওয়ার লক্ষণগুলো জানা যাক-

ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

শরীরের কোথাও পুড়ে গেলে, কেটে গেলে বা আঁচড় লাগলে কিছুদিনের মধ্যে তা আপনা-আপনি ভালো হয়ে যায়। ক্ষতস্থানে নতুন চামড়া তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াটি শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভূক্ত। যত দ্রুত ক্ষত সারবে, বুঝতে হবে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ততই উন্নত।

বিপরীতভাবে, ক্ষত সারতে সময় লাগলে, বুঝতে হবে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল।

লাগাতার সর্দি-কাশি হওয়া

বছরে দুই থেকে তিন বার সর্দি বা কাশি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কারো ক্ষেত্রে আরো বেশিও হতে পারে। তবে, বারবার সর্দি-কাশি হওয়া দুর্বল ইম্যুনিটির লক্ষণ।

সর্দি-কাশির জীবাণু আক্রমণ করার তিন থেকে চারদিনের মধ্যেই শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়। অ্যান্টিবডি সুপ্তভাবে এসব জীবাণুকে মেরে ফেলে। ফলে, সর্দি-কাশি হতে পারে না বা হলেও দ্রুত সেরে যায়।

কিন্তু লাগাতার সর্দি-কাশি হলে বুঝতে হবে শরীরের ইম্যুনিটি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আর ঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না।

খাদ্য পরিপাক জনিত সমস্যা

ঘনঘন পাতলা পায়খানা, পেট ফাঁপা, পেটে গ্যাস হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি দুর্বল ইম্যুনিটি নির্দেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল কোষ শরীরকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে, তাদের ৭০ শতাংশই থাকে পরিপাকনালীর কাছাকাছি।

আমাদের পরিপাকনালীতে কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অনুজীব রয়েছে। এরা আমাদের ইম্যুনিটি সিস্টেমের সদস্য। এসব অনুজীব দেহের জন্যে ক্ষতিকর অন্য অনুজীবদের ধ্বংস করে প্রতিরক্ষা দিয়ে থাকে।

শরীরে এদের সংখ্যা কম থাকলে ইম্যুনিটিও দুর্বল থাকে। যার ফলে ঘনঘন পাতলা পায়খানাসহ অন্যান্য সমস্যাগুলো প্রায়ই হতে থাকে।

অল্প পরিশ্রমে ক্লান্তি

অফিসের বড় কোন প্রজেক্ট বা বিশাল কোন অনুষ্ঠান আয়োজন শেষে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বৈবাহিক বা পারিবারিক কোন অশান্তিতে প্রচণ্ড মানসিক চাপ পড়লেও শরীরে ক্লান্তি অনুভূত হয়। এটি স্বাভাবিক ধরে নেওয়া যায়।

কিন্তু খুব সামান্য পরিশ্রম, যেমন স্বাভাবিক হাঁটা-চলা, ঘরোয়া কাজ, রান্নাবান্না, সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠা ইত্যাদি কাজের পর অত্যধিক ক্লান্ত অনুভব করা মোটেই স্বাভাবিক নয়।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে চাপ নিয়ে কাজ করলে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়।

এর কারণ হচ্ছে, অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে লিম্ফোসাইট ও শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যায়। এ দুটি কোষ জীবাণু বা রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। এদের সংখ্যা কমে গেলে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহজেই শরীরকে আক্রমণ করতে পারে।

ঘনঘন রোগাক্রান্ত হওয়া

কিছুদিন পরপরই রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়া শরীরের জন্যে অশনি সংকেত। একটি গবেষণার রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু বৈশিষ্ট্য কারো মধ্যে থাকলে বুঝতে হবে তার ইম্যুনিটি সিস্টেম দুর্বল। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

  • কানে সংক্রমণজনিত রোগ বছরে ৪ বারের বেশি হওয়া।
  • বছরে ২ বার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া।
  • ব্যাকটেরিয়া জনিত সাইনুসাইটিসে বছরে ৩ বারের বেশি আক্রান্ত হওয়া।
  • বছরে ২ বারের বেশি কোন কারণে এন্টিবায়োটিক নেওয়ার প্রয়োজন হওয়া।

দিনের বেশিরভাগ সময় ক্লান্তি অনুভব করা

পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দেয়। তবে একটানা ঘুমের পরেও যদি ক্লান্তি অনুভূত হয়, তাহলে সেটা শরীরের জন্যে মঙ্গলজনক নয়।

এটি দ্বারা বুঝা যায় শরীরে সুপ্ত কোন জীবাণুর আক্রমণ হয়েছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করছে বা ব্যবহার করছে। ফলে, সজীব থাকার মতো পর্যাপ্ত শক্তি শরীরে অবশিষ্ট থাকে না এবং ক্লান্তি অনুভূত হয়।

দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত বা ধীর গতিতে হওয়া

ধীর গতির দৈহিক বৃদ্ধি দুর্বল ইম্যুনিটির অন্যতম লক্ষণ। এটি সাধারণত বাচ্চাদের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে দৈহিক বৃদ্ধি যাচাই করা সম্ভব হয় না।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ বৃদ্ধি স্বাভাবিক না হওয়া অপুষ্টির লক্ষণ। এর ফলে শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় উপকরণ অনুপস্থিত থাকে।

রক্তের সাথে সম্পর্কিত ব্যাধি

রক্ত ও রক্তপাতের সাথে সম্পর্কিত কিছু রোগব্যাধি দুর্বল ইম্যুনিটি নির্দেশ করে থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • হিমোফিলিয়া,
  • এনিমিয়া, ইত্যাদি।

এছাড়াও কিছু ব্লাড ক্যান্সার রয়েছে যেগুলো রক্তের সাথে সম্পর্কিত রোগ এবং দূর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার নির্দেশ করে। যেমন-

  • লিম্ফোমা,
  • লিউকেমিয়া,
  • মায়েলোমা, ইত্যাদি।

স্বতঃঅনাক্রম্য ব্যাধি

স্বতঃঅনাক্রম্যতা বলতে বুঝায় শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো যখন শরীরের ভালো কোষগুলোকেই ধ্বংস করতে থাকে। এর ফলে শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে।

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বা অতিরিক্ত কমে গেলে এ সমস্যাটি হতে পারে। এ অবস্থায় আমাদের শরীর রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে সহজেই আমরা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ি।

অ্যালার্জি বা চর্মরোগ

জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমেই যে অঙ্গটি বাধা দান করে তা হলো শরীরের চামড়া। বাধা দিতে না পারলে তখন চামড়ায় বিভিন্ন ধরণের চর্মরোগ দেখা দিয়ে থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে ত্বকে শুষ্কতা দেখা যায়।

এ ধরণের বৈশিষ্ট্য থাকলে বুঝতে হবে শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই।

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি অন পয়েন্টে থাকে, তবে আপনি লাইভ সেভিং মুডে আছেন। আর যদি অফ বা অন-অফের মাঝামাঝি থাকে, তবে বুঝতে হবে এটি দূর্বল হয়ে গিয়েছে। যেসব লক্ষণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দূর্বলতা প্রকাশ পায়, সেগুলো জানলেন। এগুলো ছাড়াও ব্যাক্তি বিশেষে আরো কিছু ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ থাকতে পারে। যেমন-

  • মাঝে মাঝে অকারণেই জ্বর হওয়া।
  • হাত ও পায়ের মাংস পেশীতে ব্যাথা অনুভত করা।
  • সারা বছরই কোন না কোন ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হওয়া।
  • বিভিন্ন জটিল রোগ (ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, এইডস) থাকা।
  • অপুষ্টিতে ভোগা, ইত্যাদি।

আপনার মধ্যে যদি উপরোক্ত লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে যে খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় সেগুলো খাওয়া শুরু করুন। আর যদি একাধিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, তবে সাথে সাথেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ১২টি উপায়

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিত। শরীরে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে, তাহলে বিভিন্ন ভয়ংকর রোগ বাসা বাঁধবে। ফলে, নিজের অর্থের যেমন ক্ষতি হবে, ক্ষতি হবে দেহেরও।

তাই, সুস্থ ও সুখী জীবনযাপনের জন্য, নিজের দেহকে রোগ প্রতিরোধের জন্য ক্ষমতাবান করে তুলতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর অনেকগুলো উপায় রয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং ওয়েবসাইট, Health.Harvard এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বেশ কিছু উপায় তুলে ধরা হয়েছে।

আজকের এই লেখায় হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন গবেষকদের দেয়া তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো। অযথা ভূমিকা বড় না করে, মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়

শাক সবজি খান

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে শাক সবজির বিকল্প কিছু নেই বলে জানিয়েছে খাদ্য বিশারদগণ। আপনার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হলে আপনাকে অবশ্যই শাক সবজি খেতে হবে নিয়মিতই। আর জেনে রাখা প্রয়োজন যে, শাক-সবজির মধ্যে বিভিন্ন সবজির বীজও অন্তর্ভুক্ত।

যেমন, বাঁধাকপিতে থাকা এক ধরনের উপাদান আছে যা রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। সে-সব উপাদান অন্ত্র-এপিথেলিয়াল লিম্ফোসাইটস (আইইএল) হিসাবে পরিচিত। অন্ত্র এবং ত্বকের রোগ প্রতিরোধক কোষগুলোকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্যে করে এটি। এতো কেবল একটি সবজির গুণাগুণ। এরকম অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন উপকারিতা রয়েছে শাক সবজির।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

শারীরিক ব্যায়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোসহ মানব দেহে অসংখ্য প্রভাব ফেলে। নিয়মিত ব্যায়াম শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ জাতীয় রোগ বালাই থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে। ব্যায়াম হিউমোরাল এবং সেলুলার ইমিউন সিস্টেম উভয়ের উপর প্রভাব ফেলে। ব্যায়াম করলে মানুষের শ্বাসযন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। ফলে, ঠাণ্ডা লাগা, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্যান্য রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

ব্যায়াম করার পর শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, যার দরুন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো বংশ বিস্তার বা বৃদ্ধি ঘটে না। এছাড়া ব্যায়াম স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে, দুশ্চিন্তা কিংবা ক্লান্তি থাকে না। আর এই দুশ্চিন্তা থেকেও অনেক রোগ হয়ে থাকে। কাজেই, শারীরিক এবং মানসিক নানা রকম রোগ ব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম করা প্রয়োজন।

ফল খান

ছোট থেকে বড়, কমবেশি সবারই সব ধরণের ফল পছন্দের। বাংলাদেশে বিভিন্ন ঋতুতে, বিভিন্ন রকম ফল পাওয়া যায়। প্রতিটি ফলে আলাদা আলাদা উপকারিতা বিদ্যমান। তবে, প্রত্যেকটি ফল আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

ইউএস ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন, এনএলএম এর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, ফল ও শাক সবজি রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। কারণ ফল এবং শাকসবজিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অন্যান্য উপাদান রয়েছে যা যে-কোনো জীবাণুকে অকার্যকর করতে পারে।

উক্ত গবেষণায় দেখা যায়, ফল বা সবজি গ্রহণ সি-রিএক্টিভ প্রোটিন এবং টিউমার ন্যাক্রোসিস ফ্যাক্টরের মাত্রা হ্রাস করে এবং γδ-T সেল বৃদ্ধি করে।

রান্নার মধ্যে প্রয়োজনীয় মশলা ব্যবহার করুন

রান্নার মধ্যে মশলা ব্যবহার করার কথা শুনে অনেকে ঘাবড়ে যেতে পারেন। কেননা, অনেকের ধারণা মশলাযুক্ত খাবার ওজন বৃদ্ধি বা হার্টের অসুখের কারণ। আসলে, মশলাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পরিমিত মাত্রায় মশলা আপনার কোন ক্ষতি-তো করবেই না, বরং অনেক উপকার করবে।

যেমন, রসুন এবং আদা উভয়ই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া, রসুন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। বিশেষত, কাঁচা রসুনে অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল এবং ক্যান্সার বিরোধী উপাদান রয়েছে। আর আদা বমি বমি ভাব, সর্দি এবং হাঁচি, ঠাণ্ডা লাগার মত রোগের চিকিৎসার জন্য বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

অপর দিকে লং, গোল মরিচ গ্যাস্ট্রিকসহ অন্যান্য রোগে বেশ উপকারী। সব মশলার উপকারিতা এই সংক্ষিপ্ত লেখায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাই, রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে রান্না করার সময় মশলা ব্যবহার করুন।

ধূমপান বন্ধ করুন

সিগারেটের বক্সেই লেখা থাকে ধূমপান মৃত্যু ঘটায়। সুতরাং ধূমপানের অপকারিতা আমাদের না বললেও চলবে। ধূমপান করলে, আপনার দেহ রোগ জীবাণুর জন্য অভয়াশ্রমে পরিণত হবে। দেহকে রোগ জীবাণু থেকে মুক্ত রাখতে হলে আজকে থেকে ধূমপান পরিহার করুন আর দেখুন আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতখানি বেড়ে গিয়েছে।

যারা ধূমপান করেন, তাদের প্রায় সবাই এর সাইড ইফেক্টের কথা জানেন। আর এই নিয়মিত ধূমপায়ী মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই আছেন যারা প্রায়ই ধূমপান ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু কেন যেন পেরে ওঠেন না। আসলে যারা ধূমপান করেন, তাদের রক্তের কণায় কণায় নিকোটিনের চাহিদা তৈরি হয়ে আছে। তাই, কেউ হয়তো ১ দিন ধূমপান না করে থাকতে পারছেন, কেউ ২ দিন, আবার কেউ হয়তো অনেক দিন।

যে যতই বলুক না যে, ধূমপান ত্যাগ করা শুধু মাত্র নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল; আসলে এটি ছাড়া অনেক কঠিন একটা কাজ। যারা ছাড়ার চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি, তারাই ভাল বলতে পারবেন। তবে, ধূমপান বা সিগারেট খাওয়া ত্যাগ করার ১৩টি চ্যালেঞ্জিং উপায় রয়েছে। আপনি যদি এগুলো অ্যাপ্লাই করেন, তবে অবশ্যই সফল হবেন।

মাদকদ্রব্য পরিহার করুন

মাদকদ্রব্য কোন খাদ্য নয়, মাদকদ্রব্য হল বিষ। দীপক সরকার, এম ক্যাথরিন জং, এইচ জো ওয়াং এই তিনজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ মাদকদ্রব্য রোগ প্রতিরোধে কোন প্রভাব ফেলে কিনা; তার গবেষণা করেন। গবেষণায় মাদকদ্রব্যর কোন উপকারিতা আসেনি, বরং বিভিন্ন রোগের কারণ হিসাবে দেখা গেছে। মাদকদ্রব্য নিউমোনিয়া, লিভারের রোগ এমনকি ক্যান্সরের কারণ।

সহজলভ্যতার কারণে এবং কারো কারো ক্ষেত্রে হতাশার কারণে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে, তরুণ সমাজে, বিশেষত যারা পড়াশুনায় রয়েছে, তাদের মাঝে মাদকের মাদকতা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তারা কি জানে যে তারা আসলে ধীরে ধীরে নিজেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে খতম করে দিচ্ছে? এমন সময় আসবে, যখন অসুস্থ্য হলে কোন ঔষধই তাদের ক্ষেত্রে কাজ করবে না। সুতরাং, বাঁচতে হলে এখনই মাদকদ্রব্য পরিহার করুন, যদি আপনার মাঝেও থেকে থাকে।

পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমান

ঘুমের অভাবে শরীরে টি কোষের কার্যকলাপ হ্রাস হয়ে যায়। ফলে, আপনার দেহে থাকা কোষগুলো রোগ জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করে জয়ী হতে পারে না। আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেয় কম ঘুম বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন, এটা সকলের জন্যেই প্রয়োজন।

ঘুম অনেকটা রিচার্জের মতো। আমরা যদি স্মার্টফোনের ব্যাটারি পুরোপুরি রিচার্জ না করি, তবে যখন তখন চার্জ শেষ হয়ে বিপদে পড়ি। তেমনই যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমের ব্যাপারে সচেতন না হই, তবে শরীরের ইমুউন সিস্টেম ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করবে।

ঘুমানোর পূর্বে স্মার্টফোন সহ সকল ডিজিটাল ডিভাইস দূরে রাখুন। কেননা এগুলো ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। নিয়মিত সঠিক টাইমে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। ঘুমানোর উত্তম সময় হল রাত ১০টা এবং ঘুম থেকে উঠার উত্তম সময় হল সকাল ৫টা বা ৬টা। অনেকে চেষ্টা করেও ভাল মতো ঘুমোতে পারেন না। ভাল ঘুমের জন্য যে-সব ভিটামিন প্রয়োজন, সে-সব ভিটামিন গ্রহণ করুন। অবশ্যই আপনার ভাল ঘুম হবে।

ওজন ঠিক রাখুন

অতিরিক্ত ওজন শরীর ও মন দুটোর জন্যই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বেশি বা অস্বাভাবিক ওজনের কারণে ডায়াবেটিস, হার্টে রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, অস্টিওআর্থ্রাইটিস নামক রোগ হয়ে থাকে। বুঝতেই পারছেন এ-সব রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যখন আপনার ওজন বৃদ্ধি পায়।

সুতরাং, বুঝতেই পারছেন ইমিউন সিস্টেমকে সুপার পাওয়ার দিতে হলে আপনার ওজনকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে হবে। ওজন কমানো বা কন্ট্রোলে রাখা কিন্তু খুব একটা সহজ কাজ নয়। এ জন্যে একজন মানুষকে ঘুম, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে আরো অনেক কিছু মেনটেন করতে হয়। তবে, ওজন কমানোর সঠিক কিছু উপায় আছে, আপনাকে সেগুলো জানতে হবে এবং মেনে চলতে হবে।

দুশ্চিন্তা বন্ধ করুন

দুশ্চিন্তা নিজেই একটি রোগ। আর এই রোগ আপনার দেহে থাকলে সে অন্য রোগদেরকেও আপনার দেহে দাওয়াত করে নিয়ে আসবে। ঘুম না আসা, হৃদরোগ, মাথাব্যথা, ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ ইত্যাদি নানা রোগের কারণ দুশ্চিন্তা। কাজেই, এ-সব রোগ থেকে রেহাই পেতে হলে দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে।

এটা সত্যি যে, কেউ তো আর ইচ্ছে করেই দুশ্চিন্তা করে না। জীবন চলার পথে নানা রকম টানা-পোড়নে পড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। এ সময় অনেকেই মানসিক চাপ সামলাতে পারে না। তবে, প্রচন্ড মানসিক চাপে পড়ে গেলে করণীয় কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো ফলো করার মাধ্যমে আপনি দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচতে পারেন।

ভেষজ ঔষধকে গুরুত্ব দিন

অসুস্থ্য হলে আমরা সাধারণত যে সকল ঔষধ খেয়ে থাকি, সেগুলোর প্রায় প্রতিটিরই কোন না কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিশেষ করে, এন্টি-বায়োটিক জাতীয় প্রায় সকল ঔষধের সাইড ইফেক্ট আছে। আর সবচেয়ে বড় ইফেক্টিই হচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দূর্বল করে দেয়া।

কাজেই, অসুস্থ হলে ভেষজ ঔষধ খাওয়ার চেষ্টা করুন। ভেষজ ঔষধের কোন পার্শপ্রতিক্রিয়া থাকে না। ফলে, আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। তাই, সব সময় ভেষজ ঔষধকে প্রাধান্য দিন।

প্রোটিন ও জিংক গ্রহণ করুন

প্রোটিন যেমন রোগ প্রতিরোধ করে, তেমনই জিংকও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে তোলে। প্রোটিন শরীরের ভেতরের ব্যবস্থাকে বিস্তরভাবে প্রভাবিত করে অর্থাৎ, শরীর ইন্টারনাল সিস্টেমকে শক্তি যোগায়। সেই সাথে জিংকে রয়েছে জীবন দানকারী উপাদান, বিশেষত শরীরের কোষগুলোকে নতুন জীবন দানে জিংক দারুণভাবে কাজ করে থাকে।

মুরগির মাংস ও ডিমে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন। গরুর মাংসে প্রোটিন থাকলেও অন্য পাশ্ব-প্রতিক্রিয়ার জন্যে এটি এড়িয়ে যাওয়াই ভাল হবে। মাছেও রয়েছে প্রচুর প্রোটিন এবং এটি আপনি সব ধরণের মাছেই পাবেন। আর আমাদের আরেকটি কমন খাবার ডাল যা প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে অনেকাংশেই।

জিংকের জন্যে যে জিনিসগুলো খাবেন তার মাঝে রয়েছে অন্যতম বাদাম। বাদাম খাওয়ার উপকারিতা আপনি হয়তো আগে থেকেই জানেন। জিংকের জন্যে বাদামের বাহিরে আরো খেতে পারেন শিম যা এখন এই শীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে, সবচেয়ে বেশি জিংক পাওয়া যায় দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবারে। কাজেই, জিংক পেতে এ ধরণের খাবার খেতে ভুলবেন না।

ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি১২

রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন সি এর কার্যকারিতা চিরকালই শোনা যায়। ডাক্তাররা প্রায়ই বিশেষ এই ভিটামিনটির কথা বলে থাকেন, বিশেষ করে শিশুদেরকে ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাওয়ানোর কথা বলেন। যাতে ছেলেবেলাতেই তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন উন্নত আর শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একই সাথে, ভিটামিন বি১২ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তুলতে অতুলণীয় ভূমিকা পালন করে থাকে।

লেবু ও কমলালেবুতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়, এটা আমরা সবাই জানি। পেয়ারায় প্রচুর ভিটামিন সি আছে যা আমাদের দেশের প্রায় সব জেলাতেই হয়ে থাকে। এছাড়াও, জাম্বুরা, আমলকী ও আমড়ায়ও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। আর ভিটামিন বি১২ পাবেন সব ধরণের ডিমে এবং দুধে। এছাড়া, দুগ্ধজাত সব খাবারেও পাবেন ভিটামিন বি১২।

শেষ কথা

এই ছিল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ১০টি উপায়। উপরে উল্লেখিত উপায়গুলো সবার পক্ষে অনুসরণ করা সহজ। তাই, এসব উপায়গুলো নিজে অনুসরণ করুন এবং শেয়ার করে অন্যকে জানিয়ে দিন।

 

Post a Comment