Hemoglobin / হিমোগ্লোবিন কি? হিমোগ্লোবিন কমে গেলে কি হয়? যে ১০টি খাবার রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ায়।
Hemoglobin / হিমোগ্লোবিন শব্দটির সঙ্গে আমরা প্রায় সবাই কম বেশি পরিচিত। এমনকি, এ শব্দটি মাথায় আসলেই আমাদের রক্তের কথা মনে পড়ে। কারণ, আমরা জানি এ শব্দটি রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষসহ মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী সকল প্রাণীর রক্তেই হিমোগ্লোবিন থাকে যা অক্সিজেন পরিচালনাসহ শরীরের আরও অন্যান্য কার্যাবলী সম্পন্ন করে থাকে।
আসুন হিমোগ্লোবিন সম্পর্কে বিস্তারিত জানি। এটি কি, কিভাবে আমাদের দেহে কাজ করে, এর রেঞ্জ কত, ইত্যাদি সব বিষয়েই সম্যক ধারণা নিয়ে রাখি।
হিমোগ্লোবিন কি?
হিমোগ্লোবিন আমাদের শরীরের একটি প্রয়োজনীয় প্রোটিন, মেডিকেল সায়েন্সের ভাষায় একে মেটালোপ্রোটিনও বলা হয়ে থাকে। এটি আমাদের রক্তের লোহিত কণিকায় থাকে এবং রক্তের মাঝে প্রয়োজনীয় ঘনত্ব বজায় রাখে। হিমোগ্লোবিনের জন্যে রক্ত যেমন ঘন হয়, তেমনি লালও হয়। রক্তের অন্যান্য উপাদান সচরাচর বর্ণহীন হয়ে থাকে, হিমোগ্লোবিনই রক্তকে লাল করে থাকে।
হিমোগ্লোবিন আমাদের দেহে দুই ধরণের প্রোটিন গঠনে ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছে মেডিকেল সায়েন্স। এর একটি হচ্ছে টারশিয়ারী আর অন্যটি হচ্ছে কোয়াটার্নারী। উভয় ধরণের প্রোটিনই শরীরের জন্যে দরকারি। আর এসব প্রোটিনের স্থায়িত্ব প্রদান করার জন্যে হিমোগ্লোবিন রক্তের মাঝে আলফা হেলিক্স নামের এক ধরণের অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপন্ন করে থাকে।
হিমোগ্লোবিনের কাজ কি?
আমরা আগেই জেনেছি হিমোগ্লোবিন বর্ণহীন রক্তকে লাল করে থাকে। সেই সাথে রক্তে থাকা নানা রকম উপাদানের পর্যাপ্ততাও নিশ্চিত করে থাকে। তবে হিমোগ্লোবিনের মূল কাজ শরীরে অক্সিজেন পরিবহণ করা। এটি মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যেসব সমস্যা হয় তার মাঝে প্রধাণতম বিষয়টি হচ্ছে অক্সিজেন স্বল্পতা।
আমরা যখন বাতাস থেকে নিশ্বাসের সঙ্গে অক্সিজেন গ্রহণ করি, তখন এটি প্রথমে আমাদের ফুসফুসে যায়। আর ফুসফুস থেকে এই অক্সিজেন শরীরের প্রতিটি টিস্যুতে, প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিবহণের দায়িত্বটি পালন করে হিমোগ্লোবিন।
শুধু তাই নয়, এই হিমোগ্লোবিনই অক্সিজেনের সাথে কার্বণ ডাই অক্সাইড বিনিময় করে। অর্থাৎ, ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে শরীরে পাঠায় আর শরীর থেকে বিষাক্ত কার্বণ ডাই অক্সাইড নিয়ে ফুসফুসে পাঠিয়ে দেয়। অতপর ফুসফুস সেটাকে আমাদের নিশ্বাস ফেলার মাধ্যমে বাইরে পাঠিয়ে দেয়।
সুতরাং, আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের রক্তের অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে হিমোগ্লোবিনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই, রক্তে যদি কখনো এই লোহিত অনু ধারণকারী পদার্থটি কমে যায়, তবে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। আর তখন আমরা অ্যানিমিয়াসহ নানা রকম শারীরিক সমস্যার সন্মুখীন হই।
রক্তে কোনও দূষিত পদার্থ দেখা দিলে হিমোগ্লোবিন সেটাকে পরিস্কার করে অর্থাৎ রক্তে যে কোন ধরণের ক্ষতিকর পদার্থ মিশ্রণে বাধা প্রদান করে। এমনকি, আমাদের শরীরে যত ধরণের বিষাক্ত গ্যাস জমা হয়, হিমোগ্লোবিন সেগুলোকে শরীরের বাইরে পরিবহণেও সহযোগীতা করে থাকে।
মানুষের দেহের রক্ত কণিকার ৯৬ থেকে ৯৭ ভাগই হয়ে থাকে হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অংশ। আর রক্তের মোট ওজনের (পানিসহ) ৩৫ ভাগই দখল করে থাকে এই হিমোগ্লোবিন। আমাদের শরীরে থাকা প্রতি ১ গ্রাম হিমোগ্লোবিন বাতাস থেকে প্রতিবার ১.৩৬ মিলিলিটার, কখনো কখনো তার চেয়ে কিছুটা বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। যারফলে, শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ, বিশেষ করে রক্তে এর পরিবহণের মাত্রা প্রায় ৭০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
আমাদের শরীরের ৯৭ ভাগ অক্সিজেন ফুসফুস থেকে হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে শরীরের নানা অংশে সরবরাহ হয়ে থাকে। যে ৩ ভাগ বাকী থাকে, তা রক্তের প্লাজমায় মিশে যায়। হিমোগ্লোবিন রক্তের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ থেকে উর্ধ্বে ১০০ বার পর্যন্ত অক্সিজেন মুভ করাতে পারে।
ফুসফুসের যেখানে অক্সিজেনের লেবেল অত্যন্ত বেশি থাকে, হিমোগ্লোবিন খুব সুন্দরভাবে সেখানে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ, যে স্থানে অক্সিজেন বেশি সেখান থেকে বাড়তি অক্সিজেন নিয়ে যেখানে কম সেখানে পৌঁছে দেয়। হিমোগ্লোবিনের প্রতিটি অনুর ৪টি আয়রণ পরমাণু থাকে। আর প্রতিটি আয়রণ পরমাণু একটি করে অক্সিজেন গ্রহণ করে।
হিমোগ্লোবিন আমাদের রক্তকে রক্তিম করে, গাঢ় করে, রক্তের উপাদান ঠিক রাখে। মাতৃগর্ভে প্রতিটি সন্তানের শরীরেই প্রাকৃতিকভাবে অ্যাডাল্ট টাইপ হিমোগ্লোবিন উৎপন্ন হয় যেটাকে হিমোগ্লোবিন এ-টু বলে। ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন ধরণের রক্ত পরীক্ষায় হিমোগ্লোবিন এ-টু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এমনকি, রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কত, নরমাল না হাই না লো সেটা জানতেও হিমোগ্লোবিন এ-টু এর প্রয়োজন হয়। আর এই গুরুত্বপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জন্মগতভাবেই বাবা মা’র কাছ থেকে সব সন্তানই পেয়ে থাকে।
কিন্তু নানা কারণে শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমতে থাকে এবং আমরা লো লেবেল হিমোগ্লোবিনের মুখোমুখি হই। মহিলারা সাধারণত সন্তান প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হিমোগ্লোবিন সংকটে পড়ে অর্থাৎ এ সময় তাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের মারাত্মক অভাব দেখা দেয়।
মায়ের শরীরে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে সন্তানের শরীরেও কম থাকে। অর্থাৎ, জন্মগতভাবে সন্তান মায়ের কাছ থেকে যতটুকু হিমোগ্লোবিন এ-টু পাওয়ার কথা ততটুকু পায় না। ফলে, সন্তানের শরীরেও হিমোগ্লোবিনের অভাব দেখা দেয়।
আর প্রাপ্ত বয়স্কদের শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার নানা কারণ থাকে। অ্যাক্সিডেন্টের ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে, শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে, পাইলস্ এর মতো রোগ থাকলে হিমোগ্লোবিনের অভাব দেখা দেবে। আজ আমরা জানবো এই অভাব দেখা দিলে, হিমোগ্লোবিন কমে গেলে আমাদের শরীরে কী কী সমস্যা হয়-

হিমোগ্লোবিন কি এবং আমাদের শরীরে এই হিমোগ্লোবিনের কাজ কি এ সম্পর্কে আমরা মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছি। এবার হিমোগ্লোবিনের অভাবে কি হয় সে সম্পর্কে আমরা আমাদের ধারণাকে পরিস্কার করে নেবো।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে নি:শ্বাসে সমস্যা হয়
আমরা আগেই জেনেছি যে আমাদের শরীরে অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের গুরু দায়িত্বটি পালন করে হিমোগ্লোবিন। এটি ফুসফুস থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে শরীরের সব স্থানে পরিমাণ মতো পৌঁছে দেয়। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন যদি রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যায়, তবে শরীরে সর্বত্র অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক হিমোগ্লোবিন না থাকার কারণে শরীরের কিছু কিছু অংশে অক্সিজেন পৌঁছে না। ফলে, নি:শ্বাসে দূর্বলতা দেখা দেয়। অর্থাৎ, স্বাভাবিক নি:শ্বাস বাধাগ্রস্ত হয়। আর কখনো কখনো দেখা যায় নি:শ্বাস নিতে অস্বাভাবিক কষ্ট হয়।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে শারীরিক দূর্বলতা দেখা দেয়
হিমোগ্লোবিন কম থাকা মানে শরীরে রক্ত কম থাকা এবং রক্তের ঘনত্বও স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকা। এ রকম অবস্থায় শরীর তার প্রয়োজনীয় ফাংশনালিটি পায় না। ফলে, শারীরিক দূর্বলতা দেখা দেয়। দৈনন্দিন কাজ-কর্ম করার জন্যে স্বাভাবিক যে শক্তির প্রয়োজন, তাতে বেশ ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে শরীরের হাঁড়গুলোতে শক্তির অভাব দেখা দেয়।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে মাথা ব্যথা হয় ও মাথা ঘোরে
শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো মাথায়ও স্বাভাবিক রক্ত চলাচল প্রয়োজন। সেই সাথে, মাথায় প্রবাহিত রক্তে যথেষ্ট্য পরিমাণে হিমোগ্লোবিনের প্রয়োজন। যদি তা না থাকে, অর্থাৎ পরিমাণ মতো হিমোগ্লোবিনের অভাবে মাথা ব্যথা দেখা দেয়। সেই সাথে মাথা ঘোরে, ঝিম ঝিম করতে থাকে, সারাক্ষণ একটা অস্বস্তি লেগে থাকে।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে হার্ট বিট বেড়ে যায়
আমরা সকলেই জানি যে হার্ট বা হৃৎপিন্ড আমাদের দেহে রক্ত পরিশোধনের কাজটি করে থাকে। প্রতিদিন একজন মানুষের হার্ট প্রায় ৭০০ গ্যালন রক্ত পরিশোধন করে থাকে। আপনি হয়তো এই ভেবে অবাক হতে পারেন যে, একজন মানুষের শরীরে ৭০০ গ্যালন রক্ত আসবে কোথা থেকে!
আপনার ভাবনা এক অর্থে ঠিক। কিন্তু আপনার জানা প্রয়োজন যে, আমাদের দেহে যে রক্ত প্রবাহ চলতে থাকে, সেগুলো ঘুরে-ফিরে হার্টে আসে আর হার্ট সেগুলো পরিশোধন করে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাঠিয়ে দেয়। হার্টের মাধ্যমে ব্লাডের এই সার্কুলেশন চলতেই থাকে। বুঝতেই পারছেন, আমাদের দেহে যথেষ্ট্য পরিমাণ রক্ত না থাকলে এবং রক্তে হিমোগ্লিবেনর ঘাটতি দেখা দিলে, হার্টের এই ব্লাড সার্কুলেশন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে, আমাদের হার্ট বিট বেড়ে যায় যা মোটেই সুখকর নয়।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়
হিমোগ্লোবিনের অভাবে অনেক সময়ই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। আমরা সকলেই জানি যে রক্ত সাধারণত গরম হয়ে থাকে। যেমন, কোন কারণে আমাদের শরীরে কোথাও কাটা গেলে যে রক্ত বের হয় তা ধরলে হাল্কা গরম অনুভূত হয়। আসলে রক্তের মধ্যে থাকা হিমোগ্লোবিনই আমাদের হাত-পা হাল্কা গরম করে রাখে। আর যখনই হাত পা’য়ে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি তৈরি হয়, তখনই হাত, পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যায় ও হলুদ বর্ণ ধারণ করে
হিমোগ্লোবিনের অভাবে হলুদ বর্ণ ধারণ করে আমাদের ত্বক। এ রকম অবস্থায় অর্থাৎ যখন ত্বক হলুদ হয়ে ওঠে, অনেকেই তখন এটাকে জন্ডিস হয়েছে ভেবে ভুল করে থাকে। আসলে, ত্বকের স্বাভাবিক রঙের পেছনে রক্তের হিমোগ্লোবিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আর যখন ত্বকের নিচে যথেষ্ট্য পরিমাণ হিমোগ্লোবিন প্রবাহিত না হয়, তখন আমাদের শরীরের ত্বক আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
হিমোগ্লোবিনের অভাবে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়
রক্তে যদি যথেষ্ট্য পরিমাণে শরীরের জন্যে পাওয়ারফুল হিমোগ্লোবিন না থাকে, তবে সেটা আমাদের মনোযোগেও প্রভাব ফেলে। কারণ, শরীর ও মনের মাঝে রয়েছে গভীর সংযোগ, সুবিশাল সেতুবন্ধন। শরীরে যখন কোন কিছুর অভাব দেখা দেয়, তখন সেটি মনকেও প্রভাবিত করে।
হিমোগ্লোবিনের বেলায়ও একই রকম হয়ে থাকে। এটির অভাবে শরীরে যেমন নানা রকম সমস্যা তৈরি হয়, তেমনি মনেও দেখা মারত্মক সংকট। তার মাঝে সবচেয়ে বড় সংকটই হচ্ছে মনোযোগে সমস্যা। অর্থাৎ, কোন কিছুতে ঠিক মতো মনোযোগ দিতে না পারা।
যেসব খাবার হিমোগ্লোবিন বাড়ায় সেগুলো আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতেই রয়েছে। রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে খাবার, বিশেষ করে প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার বিকল্প নেই। ভিটামিন বা আয়রন পিল না নিয়ে খাবার খেয়েই রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ানো যায়। ঔষধের কিছু না কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকেই, কিন্তু প্রাকৃতিক খাবারের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া একেবারেই নেই।
রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার কিছু কারণ রয়েছে যেগুলো আমাদের সকলেরই জেনে রাখা দরকার। কারণ, রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়, শারীরিক দূর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, মাথা ব্যথা করে, মাথা ঘোরে, হার্টবিট বেড়ে যায় এবং অনেক সময় হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। কাজেই, আমাদের প্রত্যেকেরই রক্তে যথেষ্ট্য পরিমাণ হিমোগ্লোবিন থাকা চাই।
রক্তে সঠিক মাত্রায় হিমোগ্লোবিন না থাকলে শরীরে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি দেখা দেয় সেটি হচ্ছে অক্সিজেন স্বল্পতা। কারণ, আমাদের শরীরের আয়রণ সমৃদ্ধ এই প্রয়োজনীয় প্রোটিনটি অক্সিজেন পরিবহন করে থাকে। ফলে শরীরের কোষগুলো কার্যকর হয়, সচল থাকে। সেই সাথে, কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়ে যাওয়ার কারণে শরীর সব সময় ঝরঝরা থাকে।
কাজেই, শরীরের জন্যে যেমন রক্তের প্রয়োজন, তেমনই রক্তে হিমোগ্লোবিন প্রয়োজন। আর হিমোগ্লোবিন জন্যে প্রয়োজন প্রাকৃতিক খাবার যা আমাদের চারপাশে খুব সহজেই পাওয়া যায়। আসুন, সেই খাবারগুলো সম্পর্কে জানি যেগুলো রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে সাহায্য করে।
যেসব খাবার হিমোগ্লোবিন বাড়ায়

রক্তে হিমোগ্লোবিনের সঠিক পরিমাণ বজায় থাকা জরুরী। আর সঠিক পরিমাণের জন্যে প্রয়োজন সঠিক খাবার। যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ, ফোলেট ও ভিটামিন সি রয়েছে সেসব খাবারই মূলত হিমোগ্লোবিন বাড়ায়। নিচে এমন ১০টি খাবার সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে যা রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ সব সময় সঠিকভাবে বজায় রাখে।
১. মাংশ রক্তে হিমোগ্লিবন বাড়ায়
এটি সকলেরই জানা এবং মেডিকেল সায়েন্স দ্বারা প্রমাণিত যে, মাংশ, বিশেষ করে লাল মাংশ আয়রণের একটি বড় উৎস। আর আমরা সকলেই জানি যে আয়রণ হচ্ছে রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর হাতিয়ার। বিভন্ন ধরণের মাংশ সহায়তা করে শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- লিভার: আয়রণ, ভিটামিন বি১২ এবং ফোলেটের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে লিভার। এর মাঝে ছাগলের লিভারে সবচেয়ে বেশি বি১২ ভিটামিন রয়েছে যার পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে ৮৫.৭ মিলিগ্রাম। এছাড়াও এটিতে প্রচুর পরিমাণে ফোলেট, আয়রন ও ভিটামিন সি রয়েছে যার পরিমাণ প্রতি ১০.২ গ্রামে ৪০০ মিলিগ্রাম।
- চর্বিহীন গরুর মাংশ: চর্বি ছাড়া গরুর মাংশ আয়রণের আরও একটি দুর্দান্ত উৎস। প্রতি ৮৫ গ্রাম গরুর মাংশে ২.১ গ্রাম আয়রণ রয়েছে যা হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে উৎকৃষ্ট ভূমিকা পালন করে থাকে।
- মুরগীর সিনার মাংশ: পর্যাপ্ত আয়রণ সোর্স হিসেবে আরেকটি খাবার হচ্ছে মুরগীর সিনার মাংশ। প্রতি ১০০ গ্রাম মুরগীর মাংশে, বিশেষ করে সিনার মাংশে আপনি কমপক্ষে ০.৭ মিলিগ্রাম আয়রণ পাবেন যা আপনার শরীরে হিমোগ্লোবিনের সঠিক মাত্রা বজায়ে সহায়তা করবে।
২. ফলমূল হিমোগ্লোবিন বাড়াতে সাহায্য করে
ফলমূলে প্রচুর ভিটামিন আছে যার মাঝে হিমোগ্লিবিনের জন্যে দরকারি ভিটামিন বি১২, ভিটামিন সি এবং আয়রণ পাওয়া যায়। সব ফলই শরীরের সুস্থ্যতার জন্যে ফলপ্রসু, তবু শুধু মাত্র যেসব ফল হিমোগ্লিবন বাড়ায় সেগুলো নিচে দেয়া হল-
- কমলা: কমলায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি যা আয়রণের কম্বিনেশনে রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন করে।
- লেবু: ভিটামিন সি এর সিম্পল উৎস যে লেবু তা আমরা সবাই জানি। আর স্বল্প পরিমাণেও হলেও এটিতে রয়েছে আয়রণ। ভিটামিন সি আর আয়রণের মিলিত কার্যক্রমে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বজায় থাকে আমাদের সবার শরীরে।
- স্ট্রবেরি: ভিটামিন সি ও সিম্পল আয়রণের আরেকটি উৎস হচ্ছে স্ট্রবেরি।
- আপেল: রক্তে হিমোগ্লোবিনের নরমাল লেবেল বজায় রাখতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে একটি সাধারণ আপেল। অন্যান্য পুষ্টির সাথে আপেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ যা হিমোগ্লিবিনকে শরীরে গ্লোবালাইজ করে থাকে।
- ডালিম: শুধু আয়রণই নয়, ডালিমে আছে প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফাইবার এবং আরো অনেক ভিটামিন ও মিনারেল। কাজেই, যাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম, তাদের প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০ গ্রাম ডালিম খাওয়া উচিৎ যা ০.৩ মিলিগ্রাম আয়রণের ঘাটতি পূরণ করবে।
এছাড়াও, প্রায় সব ফলেই, বিশেষ করে রসালো ফলগুলিতে কিছু না কিছু আয়রণ রয়েছে। কাজেই, যেসব খাবার হিমোগ্লোবিন বাড়ায় সেগুলোর মাঝে রসালো ফল হিসেবে আরো রয়েছে আম, তরমুজ, বেদানা, ইত্যাদি।
৩. শাক-সবজি বাড়ায় রক্তের শ্বেতকণিকা
পর্যাপ্ত পুষ্টি আর ভিটামিনের ভান্ডার হিসেবে শাক-সবজি সব সময়ই ডাক্তারদের পরামর্শের তালিকার শীর্ষে থাকে। শাক-সবজিতে থাকা আয়রণ রক্তে রঙিন হিমোগ্লোবিন বাড়ায়।
- পালং শাক: আপনি যদি নিজের শরীরে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে চান, তবে প্রচুর পরিমাণে পালং শাক খান। কারণ, এতে রয়েছে যথেষ্ট্ পরিমাণে আয়রণ যা হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর পাশাপাশি আপনার যৌণ স্বাস্থ্যকেও ভাল রাখবে। প্রতি ১০০ গ্রাম পালং শাকে আছে ৪ মিলিগ্রাম আয়রন।
- ব্রোকলি: রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে ব্রোকলি বেশ উপকারি একটি সবজি। কারণ, এটি আয়রণের একটি দারুণ উৎস। আয়রন ছাড়াও ব্রোকলিতে আছে প্রচুর পরিমাণে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি। যেমন ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন এ এবং সি। প্রতি ১০০ গ্রাম ব্রোকলিতে আছে ২.৭ গ্রাম আয়রণ।
- বিটরুট: হিমোগ্লোবিনের জন্যে প্রয়োজনীয় ফোলেটের একটি বিরাট উৎস হচ্ছে বিটরুট। এটি একই সাথে আয়রণ ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর সবজি। প্রতি ১০০ গ্রাম বিটরুটে আছে ০.৪ মিলিগ্রাম আয়রণ।
- আলু: আলুতেও আছে আয়রণ, আছে ভিটামিন সি যা হিমোগ্লোবিনের জন্যে প্রতিদিনই প্রয়োজন। একটি বড় আলুতে প্রায় ৩.২ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। সুতরাং, আলু খান, আয়রন পান ও হিমোগ্লোবিন বাড়ান।
৪. সামুদ্রিক খাবার
প্রতিদিন আমাদের শরীরে যতটুকু আয়রন এবং ভিটামিন বি১২ প্রয়োজন তার প্রায় সবটুকুরই যোগান দিতে পারেন ক্ল্যাম, ঝিনুক এবং ক্যাভিয়ারের মতো সামুদ্রিক খাবার।
৫. শাপলা এবং শস্য
শাপলা এবং শস্য জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে সয়াবিন, মটরশুটি এবং ছোলা্। শস্য, যেমন সয়াবিনে রয়েছে প্রচুর আয়রণ যা শরীরের ঘাটতি পূরণে সহায়ক। সয়াবিনে শুধু আয়রণই নয়, রয়েছে ফোলেটও যা পর্যাপ্ত পরিমাণে দরকার হিমোগ্লোবিনের জন্যে। সেই সাথে, ব্রাউন রাইসেও আছে আয়রন ও ভিটামিন সি যেখানে প্রতি ১০০ গ্রামে পাবেন ০.৪ গ্রাম আয়রণ।
৬. কলাই জাতীয় ডাল
আপনি যদি আপনার দৈনন্দিন ডায়েট চার্টে পর্যাপ্ত আয়রণ সমৃদ্ধ খাবার রাখতে চান, তবে কলাই জাতীয় সব ধরণের ডাল রাখুন।
৭. ঝিনুক
আয়রনের একটি উচ্চ মাত্রার উৎস হচ্ছে ঝিনুক যা সামুদ্রিক খাবার হিসেবেই গণ্য হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম ঝিনুকে পাবেন ২৮ মিলিগ্রাম আয়রণ, ২২.১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ৯৮.৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি১২।
৮. শস্যদানা
বার্লি, কুইনোয়া এবং ওটমিলের মতো শস্যদানাও আয়রন সমৃদ্ধ খাবার। প্রতি ১০০ গ্রাম শস্যদানায় আয়রণের পরিমাণ ২.৫ মিলিগ্রাম।
৯. শুকনো ফল
কিসমিস, এপ্রিকট ও খেজুরের মতো শুকনো ফলগুলোতে রয়েছে অনেক আয়রণ। আয়রণের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে এ জাতীয় শুকনো ফল খেতে পারেন হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ানোর জন্যে। জেনে রাখুন প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো ফলে আছে ০.৮ মিলিগ্রাম আয়রণ। আর আয়রণ ছাড়াও এ ধরণের শুকনো ফলে আরো রয়েছে প্রয়োজনীয় ফাইবার ও ভিটামিন।
১০. অন্যান্য খাবার
হিমোগ্লোবিনের জন্যে প্রয়োজনীয় আয়রণ, ভিটামিন সি ও ফোলেটের পর্যাপ্ত উৎস হিসেবে আরো নানা রকম খাবার রয়েছে। সেসব খাবারের মধ্যে খেতে পারেন, ডিম, কুমড়োর বিচি, বাদাম, ডার্ক চকলেট, ইত্যাদি।
শেষ কথা
এগুলোর বাইরেও আরো অনেক খাবার রয়েছে যেগুলো পর্যাপ্ত আয়রন, ফোলেট ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। তবে, আপনাকে যে প্রতিদিন সব খাবারই খেতে হবে, এমন নয়। এ তালিকা থেকে আপনি আপনার পছন্দের খাবারগুলিই খেতে পারেন। আর হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি পূরণের জন্যে এইসব প্রাকৃতিক খাবার আপনার চারপাশেই পাওয়া যাবে।
আজকের এই আর্টিকেল যদি আপনাদের ভালো লেগেছে, তাহলে অবশ্যই আর্টিকেলটি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করবেন।
ধন্যবাদ,
